নেত্রকোনার হাওরগুলো যেন এক নীরব কান্না কাঁদছে। যেখানে একসময় দেশীয় মাছের অবাধ বিচরণ ছিল, সেখানে এখন এক অদৃশ্য জাল বিস্তার করছে ধ্বংসের ছায়া। নিষিদ্ধ জালে মাছ শিকার এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, যা কেবল মাছের অস্তিত্ব নয়, সমগ্র পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ঝুঁকির মুখে থাকা জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। চায়না জাল
হাওরে ‘চায়না জাল’ আতঙ্ক
সম্প্রতি হাওর অঞ্চলে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এক ধরনের ধ্বংসাত্মক ‘চায়না জাল’ ব্যবহার করে প্রকাশ্যে চলছে মাছ শিকার। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাস ধরে হাওরের বিভিন্ন খাল ও বিলে এই নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। একটি অসাধু চক্র দিনের শেষে বা সন্ধ্যার দিকে হাওরের নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে এই জালগুলো পেতে রাখে এবং পরদিন ভোরে তা তুলে নেয়। চায়না জাল
এই জালের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এতে ধরা পড়া মাছের মধ্যে সিংহভাগই হলো দেশীয় প্রজাতির পোনা মাছ। বিশেষ করে, আমাদের অত্যন্ত মূল্যবান বোয়াল মাছের পোনা ব্যাপকভাবে শিকার হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি। প্রতিদিন ভোরবেলায় স্থানীয় বাজারে এসব পোনা মাছ বিক্রি হতে দেখা যায়, যা দেখে পরিবেশ সচেতন মানুষজন ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
কেন এই নির্বিচার শিকার?
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরগুলোতে প্রশাসন এসব অবৈধ জালের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান চালালেও এই বছর এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একদল অতি মুনাফালোভী ব্যক্তি নির্বিচারে এই ধ্বংসাত্মক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা হাওরের নির্দিষ্ট স্থানে চায়না জাল ফেলে নিয়মিতভাবে দেশীয় পোনামাছ ধরছে, যা আমাদের মৎস্য ভান্ডারকে শূন্যের কোঠায় নিয়ে যাচ্ছে। চায়না জাল
পরিবেশের উপর এর প্রভাব
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, চায়না জাল দিয়ে মাছ ধরা কেবল মাছের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং এটি সমগ্র জলজ পরিবেশব্যবস্থার ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই জালগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে, এর ফাঁদে ছোট-বড় সব মাছ এমনকি অন্যান্য জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে। ফলে মাছের প্রজনন ব্যাহত হয় এবং একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির দিকে চলে যেতে পারে। এটি খাদ্যশৃঙ্খলকে ভেঙে দেয়, যা সামগ্রিকভাবে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে যখন এমনিতেই আমাদের জলাভূমিগুলো চাপের মুখে, তখন এই ধরনের অবিবেচক কাজ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আমাদের দেশের মৎস্য ভাণ্ডার রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিকভাবে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ।
প্রশাসনের ভূমিকা ও পদক্ষেপ
স্থানীয় মৎস্য বিভাগ এই অবৈধ কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘চায়না জাল’ দিয়ে অবৈধভাবে পোনামাছ ধরার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই ধরনের জাল ব্যবহার করে মাছ ধরা দেশের মৎস্য আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ও অবৈধ।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের কার্যকলাপ মাছের প্রজনন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। যারা এই অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে অচিরেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
আপনার ভূমিকা কী?
আমাদের দেশীয় মাছ এবং জলজ পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। এই ধরনের নিষিদ্ধ জালে মাছ শিকার বন্ধ না হলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা আমাদের মূল্যবান দেশীয় প্রজাতির মাছ হারাবো, যা আমাদের জীববৈচিত্র্য এবং খাদ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এই বিষয়ে আপনি কী মনে করেন? আপনার এলাকার পরিস্থিতি কেমন? নিচে মন্তব্য করে জানান এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে অংশ নিন!