সুন্দরবন—বাংলাদেশের ফুসফুস, প্রকৃতির এক অপার বিস্ময় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। যখনই কোনো ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসে, এই ম্যানগ্রোভ বন বুক পেতে দিয়ে আমাদের রক্ষা করে। কিন্তু যে বন আমাদের রক্ষা করে, তাকে আমরা রক্ষা করতে পারছি কি? সম্প্রতি সুন্দরবনের অভয়ারণ্য থেকে ৩০০টি হরিণের ফাঁদসহ এক শিকারিকে আটকের ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি সুন্দরবনের গভীরে চলতে থাকা এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞের পর্দা উন্মোচন করে। দুই মাসে ৩০০০ ফাঁদ উদ্ধার
এই পোস্টে আমরা শুধু এই একটি গ্রেফতারের খবর বিশ্লেষণ করব না, বরং বোঝার চেষ্টা করব এর পেছনের সংঘবদ্ধ অপরাধের নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগ এবং এর সাথে আমাদের পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন-এর লড়াইয়ের সম্পর্ক কতটা গভীর। দুই মাসে ৩০০০ ফাঁদ উদ্ধার
ঘটনার অন্তরালে: যা শুধু একটি গ্রেফতার নয়
বন বিভাগের একটি সফল অভিযানে বরগুনার আরিফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে ৩০০টি ‘মালা ফাঁদ’সহ আটক করা হয়। ‘মালা ফাঁদ’ হলো নাইলনের দড়ি দিয়ে তৈরি এক ধরনের বিশেষ ফাঁদ, যা হরিণের গলায় আটকে গেলে সহজেই মৃত্যু নিশ্চিত করে। অভিযানে আরও দুজন পালিয়ে যায়, যা প্রমাণ করে এটি কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ দলের অপারেশন।
আটক আরিফুল ইসলাম স্বীকার করেছে, সে পাথরঘাটার কুখ্যাত হরিণশিকারি ‘নাসির গ্যাং’-এর সদস্য। এই নাসির বন বিভাগের তালিকাভুক্ত একজন অপরাধী। এই তথ্যটিই পুরো ঘটনাকে একটি নতুন মাত্রা দেয়। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, সুন্দরবনে যা ঘটছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন চোরা শিকার নয়, এটি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ। দুই মাসে ৩০০০ ফাঁদ উদ্ধার
সংকট যখন আরও গভীরে: অপরাধ, রাজনীতি ও নিষ্ক্রিয়তা
এই ঘটনার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কয়েকটি ভয়াবহ দিক আমাদের সামনে চলে আসে:
১. সংঘবদ্ধ অপরাধের নেটওয়ার্ক: পাথরঘাটা, শরণখোলা এবং মোরেলগঞ্জ জুড়ে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে, যারা রাতের আঁধারে সুন্দরবনে প্রবেশ করে বন্যপ্রাণী শিকার করে। ‘নাসির গ্যাং’-এর মতো একাধিক চক্র এখানে সক্রিয়। তাদের কাছে ছুরি, করাতসহ আধুনিক সরঞ্জাম থাকে।
২. রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগ: স্থানীয়দের মতে, এই চক্রগুলো রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় কাজ করে। এটি একটি মারাত্মক অভিযোগ। যদি সত্যি হয়, তবে এর অর্থ হলো, যারা আইন প্রয়োগ করবেন এবং বন রক্ষা করবেন, তাদের হাত-পা অদৃশ্য কোনো শক্তির ইশারায় বাঁধা। এই ছত্রচ্ছায়ার কারণেই অপরাধীরা বছরের পর বছর ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
৩. প্রজনন মৌসুমেও থেমে নেই অপরাধ: সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘটনাটি ঘটেছে এমন এক সময়ে যখন সুন্দরবনে তিন মাসের জন্য সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। ১ জুন থেকে বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুম ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এমন কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও শিকারিরা বনে প্রবেশ করছে, যা তাদের ঔদ্ধত্য এবং বন বিভাগের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
গত দুই মাসে বন বিভাগ তিন হাজারের বেশি হরিণের ফাঁদ উদ্ধার করেছে। ভাবুন একবার, মাত্র দুই মাসে তিন হাজার ফাঁদ! কতগুলো প্রাণী নীরবে এই ফাঁদে আটকা পড়ে মারা গেছে, তার কোনো হিসাব কি আমাদের কাছে আছে?
পরিবেশগত প্রভাব: একটি হরিণের মৃত্যু কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অনেকে ভাবতে পারেন, একটি বা কয়েকটি হরিণ মারা গেলে সুন্দরবনের মতো বিশাল বনের কী এমন ক্ষতি হবে? এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। সুন্দরবনের পরিবেশ একটি জটিল এবং আন্তঃসম্পর্কিত इकोसिस्टम বা বাস্তুতন্ত্রের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
- খাদ্যশৃঙ্খলে আঘাত: সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে রয়েছে আমাদের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বাঘের প্রধান শিকার হলো চিত্রা হরিণ এবং বুনো শূকর। যদি ব্যাপক হারে হরিণ শিকার করা হয়, তবে বাঘের খাদ্যের সংকট দেখা দেবে। খাদ্যের অভাবে বাঘ লোকালয়ে হানা দিতে পারে, যা মানুষ-বাঘ সংঘাতকে তীব্র করে তুলবে।
- বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যহীনতা: প্রতিটি প্রাণীই বনের স্বাস্থ্য রক্ষায় কোনো না কোনো ভূমিকা পালন করে। হরিণের মতো তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে বনের ঘাস ও ছোট উদ্ভিদের বিন্যাসে পরিবর্তন আসে, যা সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
- জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে দুর্বল সুন্দরবন: একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের বন যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বেশি সক্ষম। যখন চোরাশিকারিদের কারণে বনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, তখন বন ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন-এর কারণে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। একটি দুর্বল সুন্দরবন ভবিষ্যতে এই ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়গুলোর সামনে কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে, তা এক বিরাট প্রশ্ন। হরিণ শিকার তাই পরোক্ষভাবে আমাদের উপকূলীয় সুরক্ষাব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ ও বন বিভাগের প্রচেষ্টা
আমাদের অবশ্যই বন বিভাগের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতে হবে। দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়, যেখানে বাঘ, কুমির ও সাপের ভয় পদে পদে, সেখানে পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। এর মধ্যেও তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন এবং হাজার হাজার ফাঁদ উদ্ধার করছেন।
কিন্তু শুধুমাত্র বন বিভাগের পক্ষে এই বিশাল অপরাধ নেটওয়ার্ককে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ড এবং স্থানীয় প্রশাসন একযোগে কাজ করবে। সবচেয়ে জরুরি হলো, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যা এই অপরাধের নেপথ্যের নায়কদের আইনের আওতায় আনবে।
শেষ কথা
সুন্দরবনের কচিখালী থেকে উদ্ধার হওয়া ৩০০টি ফাঁদ শুধু নাইলনের দড়ি নয়, এগুলো আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতীক। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমাদের এই বিশ্ব ঐতিহ্য কতটা অনিরাপদ।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শুধু শিকারিদের গ্রেফতার করলেই হবে না, বরং এর মূল উৎপাটন করতে হবে। পাথরঘাটার ‘নাসির গ্যাং’-এর মতো চক্রগুলোকে এবং তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি, হাওরের মতো সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার মানুষের জন্য বিকল্প ও টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে দারিদ্র্যের কারণে কেউ এই ধ্বংসাত্মক পথে পা না বাড়ায়।
সুন্দরবন বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। এর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আমাদের নৈতিক ও অস্তিত্বের লড়াই। এই লড়াইয়ে জেতার জন্য আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।
আপনার মতামত কী?
সুন্দরবনের এই নীরব কান্না থামাতে আপনার মতে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ কোনটি? এই সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে আর কী করা যেতে পারে? নিচে কমেন্ট করে আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান।
পরিবেশগত সুরক্ষা, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার কৌশল নিয়ে কাজ করছেন? বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ বা প্রকল্প সহায়তার জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। একটি সবুজ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে আমরা আপনার নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারি।