এই গরমে পুড়ছে তো এই বৃষ্টিতে ভাসছে—এটাই যেন হয়ে উঠেছে আমাদের নতুন বাস্তবতা। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানাচ্ছে, বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপ আর মৌসুমি বায়ুর যৌথ প্রভাবে আজ দেশের চারটি বিভাগে বৃষ্টি বাড়তে পারে। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে দুই দিন ধরেই চলছে বর্ষণ, আজও তা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা। সমুদ্রবন্দরগুলোতে দেখানো হচ্ছে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত। উপকূলে বৃষ্টি, উত্তরে খরা
কিন্তু এই খণ্ড খণ্ড বৃষ্টি, এক এলাকার ভেসে যাওয়া আর অন্য এলাকার খটখটে শুকনো থাকা—এটা কি স্বাভাবিক বর্ষার চিত্র? নাকি আমাদের পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন কোনো গভীর সংকটের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে? চলুন, এই আবহাওয়ার খবরের আড়ালে থাকা বার্তাটি বোঝার চেষ্টা করি। উপকূলে বৃষ্টি, উত্তরে খরা
খবরের ভেতরের খবর: কী ঘটছে আসলে?
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়াবিদ আফরোজা ইসলামের মতে, এই বৃষ্টি মূলত উপকূলীয় এলাকাগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং গতকালের চেয়ে এর তীব্রতা কিছুটা কম হতে পারে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে কুষ্টিয়ায়, মাত্র ৪৬ মিলিমিটার। অন্যদিকে, শ্রীমঙ্গলে তাপমাত্রা ৩৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা বর্ষাকালেও অস্বস্তিকর গরমের জানান দিচ্ছে। উপকূলে বৃষ্টি, উত্তরে খরা
এখানেই লুকিয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। বর্ষাকাল মানে আমরা যেমনটা ভাবি—সারা দেশে একটানা রিমঝিম বৃষ্টি—তেমনটা কিন্তু হচ্ছে না। গত জুন মাসেও বর্ষার আচরণ ছিল খামখেয়ালিপূর্ণ। কয়েক দিন টানা বৃষ্টির পর হঠাৎ লম্বা বিরতি। এই প্রবণতাটিই এখন ভাবনার বিষয়।
শুধু আবহাওয়া নয়, এ হলো জলবায়ুর পরিবর্তন
বর্ষার সেই চিরচেনা রূপটা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। এখন আমরা যা দেখছি, তা হলো আবহাওয়ার চরমপন্থা। হয় একেবারেই বৃষ্টি নেই, নয়তো হুট করে আসা অতিবৃষ্টিতে বন্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটাই জলবায়ু পরিবর্তন-এর বাস্তব প্রভাব। এর কয়েকটি লক্ষণ খুব স্পষ্ট:
১. অসম বৃষ্টিপাত: লঘুচাপের কারণে শুধু উপকূলীয় এলাকাগুলোতেই বৃষ্টি সীমাবদ্ধ থাকছে, দেশের উত্তরাঞ্চলে তেমন বৃষ্টি হচ্ছে না। এর ফলে দেশের এক অংশে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, অন্য অংশে খরা বা অনাবৃষ্টির কারণে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
২. স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি: আগে যেমন কয়েক দিন ধরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হতো, এখন তার বদলে অল্প সময়ে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে পানি দ্রুত জমে গিয়ে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে, কিন্তু মাটির গভীরে পানি পৌঁছাতে পারে না। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জ হয় না।
৩. বৃষ্টির খামখেয়ালিপনা: বর্ষার একটি নির্দিষ্ট ছন্দ থাকে। কিন্তু এখন সেই ছন্দ নষ্ট হয়ে গেছে। যখন বৃষ্টি দরকার, তখন নেই; আবার অসময়ে এসে ফসলের ক্ষতি করছে।
বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়া এবং এর প্রভাবে আবহাওয়ার এমন চরম আচরণ—এ সবই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফল। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার কারণেই এমনটা ঘটছে।
শেষ কথা
সুতরাং, আজ চার বিভাগে বৃষ্টির যে পূর্বাভাস, তা কেবল একটি সাধারণ আবহাওয়া সংবাদ নয়। এটি আমাদের বদলে যাওয়া পরিবেশ এবং জলবায়ুর একটি জীবন্ত উদাহরণ। এই খামখেয়ালি আবহাওয়া আমাদের কৃষি, জনজীবন এবং অর্থনীতির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। প্রকৃতির এই সতর্কসংকেতগুলো যদি আমরা সময়মতো বুঝতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। আজকের আকাশের খবর তাই শুধু ছাতা নেওয়ার প্রস্তুতি নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবারও একটি তাগিদ।
আপনার মতামত কী?
আপনার এলাকার আকাশের খবর কী? এই খামখেয়ালি আবহাওয়া এবং বর্ষার বদলে যাওয়া রূপ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ ও ভাবনা কী? আমাদের জানান কমেন্ট বক্সে।