হালকা কুয়াশা আর হিমেল হাওয়া জানান দিচ্ছে শীতের উপস্থিতি। প্রকৃতির এই পরিবর্তন কারো জন্য পিঠা-পুলির উৎসব আর ভ্রমণের আনন্দ নিয়ে এলেও, অনেকের জন্য তা হয়ে দাঁড়িয়েছে চরম দুর্ভোগের কারণ। বিশেষ করে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর বর্তমান চিত্র রীতিমতো উদ্বেগজনক। শীতের দাপটে হাসপাতালে রোগীর ঢল মুগদা হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মতো বড় চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা গেছে, শীতজনিত রোগে আক্রান্ত নতুন রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
প্রতি বছরই এই সময়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। চিকিৎসকরা বলছেন, নিয়মিত রোগীর সংখ্যার সাথে শীতের প্রকোপে নতুন রোগীর সংখ্যা যোগ হয়ে তা প্রায় দ্বিগুণে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কেন এমনটা হচ্ছে এবং আমাদের করণীয় কী? চলুন, পরিস্থিতির গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করা যাক।
শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক: নিউমোনিয়ার চোখ রাঙানি
শীতের প্রথম ধাক্কাটা সব সময়ই শিশুদের ওপর দিয়ে বেশি যায়, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে পা ফেলার জায়গা নেই। প্রতিদিন জ্বর, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, বর্তমানে যারা চিকিৎসা নিতে আসছে, তাদের বড় একটা অংশই ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত। বিশেষ করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেক শিশু ভর্তি আছে। চিকিৎসকদের মতে, হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তনের সঙ্গে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খাপ খাওয়াতে না পারায় তারা দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে। জ্বর, সর্দি ও কাশির পাশাপাশি অ্যালার্জিজনিত জটিলতাও শিশুদের ভোগাচ্ছে। নিউমোনিয়া ওয়ার্ডগুলোতে একটি শয্যাও খালি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। শীতের দাপটে হাসপাতালে রোগীর ঢল
শ্বাসকষ্টে ভুগছেন বয়স্করা: শয্যা সংকট চরমে
শুধু শিশুরা নয়, মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধরাও শীতের তীব্রতায় কাবু হয়ে পড়ছেন। বক্ষব্যাধি হাসপাতালগুলোর চিত্র আরও করুণ। রোগীর চাপে কোথাও বসার জায়গা নেই; শয্যাসংকটের কারণে অনেক রোগীকে মেঝেতে শুয়ে বা দেয়ালে হেলান দিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, সারা দেশে শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে অ্যাজমা, নিউমোনিয়া ও ব্রংকাইটিস রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে। সাধারণ সময়ের চেয়ে রোগীর চাপ প্রায় দ্বিগুণ। বয়স্কদের পুরনো শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমা এই সময়ে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
কেন বাড়ছে এই রোগ? জলবায়ু ও আবহাওয়ার প্রভাব
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন ঋতু পরিবর্তনের ধরনও বদলেছে। হুট করে গরম থেকে হুট করে তীব্র শীত—এই আচমকা তাপমাত্রার পতন মানবদেহের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরে তীব্র শীতের কারণে ঠাণ্ডাজনিত রোগ দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে। শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় বাতাসে ধূলিকণা ও জীবাণু ভেসে বেড়ায়, যা সরাসরি শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি করে। এছাড়া বাচ্চারা শ্বাসতন্ত্রের নানা ধরনের সংক্রমণ বা ফ্লু-তে আক্রান্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সতর্কতা
শীতকালীন রোগের প্রকোপ থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা বলছেন, শীতকালের বেশিরভাগ রোগই ভাইরাসজনিত। তাই আতঙ্কিত হয়ে বা ফার্মেসির দোকানদারের পরামর্শে শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো যাবে না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। শীতের দাপটে হাসপাতালে রোগীর ঢল
সতর্কতায় যা করণীয়:
- উষ্ণতা বজায় রাখা: শিশুদের এবং বয়স্কদের সব সময় গরম কাপড়ে মুড়িয়ে রাখতে হবে। বিশেষ করে কান ও গলা ঢেকে রাখা জরুরি, যাতে ঠাণ্ডা বাতাস না লাগে।গোসলে সতর্কতা: নিয়মিত গোসল প্রয়োজন হলেও নবজাতক বা অপরিণত শিশুদের ক্ষেত্রে দেরিতে ও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গোসল করাতে হবে। কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা শ্রেয়।লক্ষণ দেখা মাত্রই ব্যবস্থা: শিশুর জ্বর, টানা কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।পরিবেশ রক্ষা: ধূলিকণা ও দূষণ থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করা এবং ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা জরুরি।
উপসংহার
শীত আমাদের প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু অসচেতনতা একে বিপদে পরিণত করতে পারে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে আবহাওয়ার মতিগতি বোঝা দায়। হাসপাতালগুলোর এই উপচে পড়া ভিড় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। নিজের পরিবারের শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের প্রতি বাড়তি যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন।
আপনার মতামত জানান:শীতের এই তীব্রতায় আপনার এলাকায় কি রোগের প্রকোপ বেড়েছে? ঠাণ্ডাজনিত রোগ থেকে বাঁচতে আপনি বা আপনার পরিবার কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন? কমেন্ট করে আমাদের জানান। গুরুত্বপূর্ণ এই তথ্যগুলো শেয়ার করে আপনার বন্ধু ও আত্মীয়দের সচেতন হতে সাহায্য করুন।



