17.5 C
Bangladesh
বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬
spot_img

পানির স্তর নামছে দ্রুত: রাজশাহীর কৃষকদের হাহাকার!

রাজশাহীর তানোর উপজেলার চোরখৈর গ্রামের কৃষক আয়েজ উদ্দিন। প্রতিবারের মতো এবারও স্বপ্ন দেখেছিলেন সোনালী ধানের। গত বছর সরকারি অনুমোদিত মোটর দিয়ে পানি তুলে প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও এক বিঘা জমিতে বীজতলা তৈরি করেছেন, কচি সবুজ চারাও গজিয়ে উঠেছে পানির স্তর নামছে দ্রুত।

কিন্তু আয়েজ উদ্দিন জানেন না, মাটির নিচে আর পানি অবশিষ্ট নেই। তিনি জানেন না, তার পায়ের নিচের মাটি এখন সরকারি গেজেটে ‘অতি উচ্চ পানি–সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। প্রশাসন বলছে, এবার আর মাটির নিচ থেকে পানি তোলা যাবে না।

আয়েজ উদ্দিনের এই না জানা এবং প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার মাঝখানে ঝুলে আছে হাজারো কৃষকের ভাগ্য। শুধু আয়েজ উদ্দিন নন, বরেন্দ্র অঞ্চলের লাখো কৃষকের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।

বিপদসীমার ওপারে: পানি–সংকটের ভয়ানক চিত্র

আমরা অনেকেই শহরের ট্যাপের পানি ছেড়ে ভাবি, পানি তো অফুরন্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের অবহেলা আর প্রকৃতির ওপর অত্যাচারের ফল এখন হাতেনাতে মিলছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এত নিচে নেমে গেছে যে, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নকে সরকার ‘রেড জোন’ বা অতি উচ্চ পানি–সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। পানির স্তর নামছে দ্রুত

পরিসংখ্যানটি চমকে ওঠার মতো। এই ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৫০৩টি মৌজায় বসবাসকারী প্রায় ৮৭ লাখ মানুষ সরাসরি তীব্র পানি–সংকটে ভুগছেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, গত ৬ নভেম্বর সরকার একটি গেজেট প্রকাশ করে জানিয়েছে—এসব এলাকায় খাবার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে (বিশেষ করে সেচের জন্য) নতুন নলকূপ বসানো বা পুরোনো নলকূপ দিয়ে পানি তোলা যাবে না। আইন অমান্য করলে বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩ অনুযায়ী তা দণ্ডনীয় অপরাধ।

কৃষকের হাহাকার: পেটে ভাত জুটবে তো?

আইন বা পরিবেশের ভারি ভারি বুলি কৃষকের ক্ষুধার্ত পেট বোঝে না। তানোর উপজেলার উচ্চাডাঙ্গা গ্রামটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে রাজশাহীর সবচেয়ে উঁচু এলাকা। এখানকার বাসিন্দা আবু বক্কার জমি তৈরি করছেন বোরো চাষের জন্য। তিনি লোকমুখে শুনেছেন পানি তোলা নিষেধ, কিন্তু তার প্রশ্ন খুবই সরল—”পানি না দিলে ধান হবে কীভাবে? আর ধান না হলে খাব কী?”

একই অবস্থা মুন্ডুমালা পৌর এলাকার আবদুল আউয়ালের। গত বছর ২০ বিঘা জমিতে ভূগর্ভস্থ পানি দিয়েই চাষ করেছিলেন। এবারও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ নিষেধাজ্ঞার খবরে তিনি দিশেহারা। সরকারিভাবে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা তাদের কাছে পৌঁছায়নি। আবদুল আউয়ালের মতো হাজারো কৃষকের একটাই কথা—ভূগর্ভস্থ পানি ছাড়া বরেন্দ্র মাটিতে ধান চাষের কোনো বিকল্প উপায় তাদের জানা নেই।

জলবায়ু পরিবর্তন নাকি আমাদের অবিবেচনা?

কেন এই অবস্থা? কেন বরেন্দ্র ভূমি আজ পানিশূন্য?

পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের পেছনে মূল ভিলেন অপরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু পরিবর্তন। বছরের পর বছর ধরে আমরা মাটির নিচ থেকে যে পরিমাণ পানি তুলেছি, প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির মাধ্যমে সেই পরিমাণ পানি আর রিচার্জ বা জমা হয়নি। পানির স্তর নামছে দ্রুত

এর সাথে যুক্ত হয়েছে পুকুর-জলাশয় ভরাট করার মরণনেশা। বরেন্দ্র অঞ্চলে একসময় অসংখ্য খাড়ি ও পুকুর ছিল, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে সাহায্য করত। কিন্তু অধিক ফসল ফলানোর লোভে আমরা সেগুলো ভরাট করে ফেলেছি। ফলাফল? প্রতি বছর পানির স্তর কয়েক ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি ‘জাতীয় পানি নীতি-২০২৫’ বাস্তবায়ন না করা হয়, তবে সামনে এই অঞ্চল বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে।

নির্দেশনা বনাম বাস্তবতা: মাঠ পর্যায়ের চিত্র

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সমন্বয়ের অভাব। সরকার গেজেট প্রকাশ করেছে ঠিকই, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে এখনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই যে, কৃষকরা চলতি মৌসুমে কী করবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের মতে, এলাকাটি পানি–সংকটাপন্ন ঘোষণা করা হলেও বোরো ধানে পানি ব্যবহার করা যাবে কি না, সে বিষয়ে তাদের কাছে লিখিত কোনো অর্ডার আসেনি। অথচ কৃষকরা বীজতলা তৈরি করে বসে আছেন।

অন্যদিকে, তানোরে সেচের আওতায় থাকা ২২ হাজার ৩৩২ হেক্টর জমির বিপরীতে বৈধ সেচযন্ত্রের পাশাপাশি প্রায় আড়াই হাজার অবৈধ নলকূপ চলছে। বিএমডিএ (বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) গত ১০ বছর ধরে নতুন গভীর নলকূপ বসাচ্ছে না এবং কৃষকদের কম পানি লাগে এমন ফসল (যেমন—সরিষা, তিল, ভুট্টা) চাষের পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু কৃষকরা ধান চাষেই অভ্যস্ত এবং লাভবান মনে করায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই অনেকে পাম্প বসাচ্ছেন।

আমাদের করণীয় কী?

এই পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করে টেকা যায় না। পানি–সংকট এখন আর কেবল খবরের কাগজের শিরোনাম নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের সংকট।

১. ফসল পরিবর্তন: কৃষকদের বুঝতে হবে, ধান চাষের জিদ ধরে রাখলে ভবিষ্যতে খাবার পানিটুকুও পাওয়া যাবে না। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ মেনে সরিষা, ভুট্টা বা ডালের মতো ফসলের দিকে ঝুঁকতে হবে যা অল্প পানিতে চাষ করা সম্ভব।

২. আইনের প্রয়োগ ও সচেতনতা: সরকারকে কেবল গেজেট প্রকাশ করলেই হবে না, মাঠ পর্যায়ে এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে কৃষকদের বিকল্প আয়ের পথ দেখাতে হবে।৩. জলাধার রক্ষা: মজা পুকুর, খাল ও খাড়িগুলো পুনর্খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আবার রিচার্জ হতে পারে।

উপসংহার

আয়েজ উদ্দিন বা আবু বক্কাররা হয়তো জানেন না ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ কী, কিন্তু এর নির্মম শিকার আজ তারাই। রাজশাহীর এই চিত্র কেবল একটি অঞ্চলের নয়, এটি পুরো বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা যদি এখনই পানির ব্যবহারে মিতব্যয়ী না হই এবং পরিবেশ রক্ষায় সচেতন না হই, তবে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো পুরো দেশই ‘পানি–সংকটাপন্ন’ এলাকায় পরিণত হবে।

প্রকৃতি আমাদের অনেক সুযোগ দিয়েছে, আর নয়। আসুন, আমরা সচেতন হই, পানির অপচয় রোধ করি এবং কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলি।

আপনার মতামত জানান: আপনি কি মনে করেন কৃষকদের বিকল্প ফসল চাষে বাধ্য করা উচিত, নাকি সরকারের উচিত বিকল্প সেচ ব্যবস্থার (যেমন নদী বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ) উদ্যোগ নেওয়া? আপনার মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান। পোস্টটি শেয়ার করে সবাইকে এই ভয়াবহ পানি–সংকট সম্পর্কে জানতে সাহায্য করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
spot_img

সর্বশেষ সংবাদ