29.1 C
Bangladesh
শনিবার, আগস্ট ৩০, ২০২৫
spot_img

তীব্র তাপের পর রেকর্ড বৃষ্টি: মে মাসের আবহাওয়া যেন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি

বিদায়ী মে মাস যেন আমাদের আবহাওয়াকে এক নতুন রূপ দেখিয়ে গেল। তীব্র দাবদাহ দিয়ে মাস শুরু হলেও শেষ হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৬৩ শতাংশ বেশি বৃষ্টিতে। শুধু তাই নয়, গত ৩১ মে সিলেটে রেকর্ড পরিমাণ ৪০৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এই অস্বাভাবিক বৃষ্টির ধরন কি কেবলই প্রকৃতির খেয়াল, নাকি জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশের উপর মানুষের অবিরাম হস্তক্ষেপের এক অনিবার্য ফল? এই প্রশ্নগুলো নিয়েই আজ আমরা আলোচনা করব। তীব্র তাপের পর রেকর্ড বৃষ্টি

মে মাসের আবহাওয়া: এক ভিন্ন চিত্র

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী মে মাসে দেশে ২৯৮ মিলিমিটারের পরিবর্তে রেকর্ড পরিমাণ ৪৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৬৩ শতাংশ বেশি। এই বৃষ্টিতে পুরো দেশ যেন সিক্ত হয়েছে। মে মাসের শুরুতে আমরা দেখেছি ভয়াবহ তাপপ্রবাহ। ১০ মে চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা পৌঁছেছিল ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ। দেশের বেশিরভাগ অংশজুড়ে যে তীব্র তাপপ্রবাহ চলছিল, তা ছিল নজিরবিহীন। তীব্র তাপের পর রেকর্ড বৃষ্টি

কিন্তু মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। ২৭ মে বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়, যা একপর্যায়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়। ২৯ মে এর প্রভাবে ব্যাপক বৃষ্টিপাত শুরু হয় এবং তারপর থেকে বৃষ্টি লেগেই আছে। বর্তমানে দেশে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত আছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৪ মে স্বাভাবিক সময়ের অন্তত সাত দিন আগে দেশে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করেছে। এটিই এখন পর্যন্ত বৃষ্টি ঝরাচ্ছে, যদিও আগামীকাল থেকে বৃষ্টি কমার পূর্বাভাস রয়েছে।

আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ প্রথম আলোকে জানান, ৩১ মে সিলেটে যে ৪০৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, তা সিলেটের জন্য একটি নতুন রেকর্ড।

জুনের পূর্বাভাস: অনিশ্চয়তার ঘেরা ভবিষ্যৎ

মে মাসে এত বেশি বৃষ্টি হলেও জুন মাসের পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে কিছুটা ভিন্ন চিত্র। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এ মাসে স্বাভাবিক বা এর চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে। তবে এখানে একটি ‘যদি’ এবং একটি ‘কিন্তু’ লুকিয়ে আছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুন মাসে এক থেকে দুটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। কিন্তু আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই নিম্নচাপের প্রভাব বাংলাদেশের দিকে কতটা পড়বে, তা এখনো অনিশ্চিত। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, নিম্নচাপের বড় প্রভাব না–ও পড়তে পারে। আর তা যদি না পড়ে; তবে বৃষ্টি বেশি না–ও হতে পারে।”

উল্লেখ্য, দেশে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় জুলাই মাসে (৫২৩ মিলিমিটার), এরপর জুন মাসে (৪৫৯.৪ মিলিমিটার)। মে মাসে গড় স্বাভাবিক বৃষ্টি হয় ২৯৮ মিলিমিটার।

আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুন মাসে এক বা দুটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি, বৃষ্টির কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে স্বল্পমেয়াদে বন্যা হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। জুনে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার পূর্বাভাসও দেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

মে মাসের এই অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং জুনের পূর্বাভাসে দেখা যাওয়া অনিশ্চয়তা আমাদের জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশের উপর গভীর প্রভাবের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এই ধরনের আবহাওয়ার পরিবর্তনকে নিছক ‘প্রকৃতির খেয়াল’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বৃদ্ধি এবং নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় এক মারাত্মক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।

এর পরিণতিস্বরূপ আমরা এখন যে বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ করছি:

  1. অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বা খরা: কোনো মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত আবার কোনো মাসে দীর্ঘস্থায়ী খরা – এই দুটিই জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণ। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত যেমন জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসের কারণ হয়, তেমনি দীর্ঘ খরা কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করে এবং পানীয় জলের সংকট সৃষ্টি করে।
  2. তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব: মে মাসে আমরা দেখেছি তাপপ্রবাহের ভয়াবহতা, যা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের তীব্রতা এবং স্থায়িত্ব উভয়ই বাড়ছে।
  3. ঘূর্ণিঝড়ের বৃদ্ধি: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। এটিও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি প্রভাব।
  4. মৌসুমি বায়ুর অনিয়ম: মৌসুমি বায়ুর আগমন ও প্রস্থান এবং এর সক্রিয়তার ধরনে যে পরিবর্তন আসছে, তা কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ।

মে মাসের বৃষ্টিপাত প্রমাণ করে যে, প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে চলছে না, বরং মানুষের কার্যকলাপের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং গাছপালা কেটে ফেলার কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে, যা পৃথিবীকে উষ্ণ করে তুলছে। এই উষ্ণতা সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে, যার ফলে নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড় এবং অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের মতো ঘটনাগুলো আরও ঘন ঘন ঘটছে। তীব্র তাপের পর রেকর্ড বৃষ্টি

পরিবেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ব

এই অস্বাভাবিক আবহাওয়ার ধারা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি আমরা এখনই পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় গুরুতর পদক্ষেপ না নিই, তাহলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।

আমাদের কী করা উচিত?

  1. জ্বালানি ব্যবহার কমানো: জীবাশ্ম জ্বালানির (পেট্রোল, ডিজেল, কয়লা) ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির (সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি) দিকে ঝুঁকতে হবে।
  2. বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ: নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বনভূমি রক্ষা করা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।
  3. সচেতনতা বৃদ্ধি: জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিটি ব্যক্তিকে তার ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
  4. নীতিমালা ও আইন প্রয়োগ: সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের উচিত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

মে মাসের অতিরিক্ত বৃষ্টি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল দূরের কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে যদি আমরা পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আন্তরিকভাবে কাজ না করি, তাহলে ভবিষ্যতের প্রজন্মকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

আসুন, আমরা সবাই পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই এবং একটি সুস্থ ও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের অবস্থান থেকে কাজ করি। এই বিষয়ে আপনার কী মনে হয়? নিচে মন্তব্য করে জানান!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
spot_img

সর্বশেষ সংবাদ