33.3 C
Bangladesh
রবিবার, আগস্ট ৩১, ২০২৫
spot_img

কীভাবে আপনার হাত ধোয়া পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর একটি নতুন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট একটি অভ্যাস—হাত ধোয়া—থেকে শুরু করে দেশের সামগ্রিক পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর এর বিশাল প্রভাব তুলে ধরেছে। হাত ধোয়া পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে

বনভূমি ও কৃষি জমির উদ্বেগজনক হ্রাস

বিবিএস-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৮ বছরে বাংলাদেশে বনভূমি কমেছে আশঙ্কাজনক হারে ৫.৫৪ শতাংশ। ২০১৫ সালে যেখানে দেশের মোট ভূমির ১২.৫৪ শতাংশ (১৮,৪৯৯.০৮ বর্গকিলোমিটার) বনভূমি ছিল, ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১.৮৬ শতাংশে (১৭,৪৯৮.১৮ বর্গকিলোমিটার)। এই বনভূমি হ্রাস কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, বরং এটি আমাদের জীববৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। হাত ধোয়া পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে

প্রতিবেদনে একটি ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে—কৃত্রিম উপায়ে সৃষ্ট বনভূমির পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৫ সালে ১,৩৪১.৪৮ বর্গকিলোমিটার কৃত্রিম বনভূমি ছিল, যা ২০২৩ সালে ২৭.৩৬ শতাংশ বেড়ে ১,৭০৮ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। তবে, প্রাকৃতিক বনের বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্ব কৃত্রিম বনভূমি দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক বনভূমি বাস্তুতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য, যা অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল এবং কার্বন শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাত ধোয়া পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে

একই সাথে, কৃষিজমিও কমছে। ২০১৫ সালে ৭৪,৩৮৬.৬৩ বর্গকিলোমিটার কৃষি জমি ছিল, যা ২০২৩ সালে ১.৯৮ শতাংশ কমে ৭২,৯১৫.৭৪ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। কৃষিজমির এই হ্রাস আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি—কৃষিখাতকে হুমকির মুখে ফেলছে।

হাত ধোয়ায় লুকানো পানির বিশাল অপচয়

বিবিএস-এর ‘পরিবেশ, পরিবর্তন ও দুর্যোগ পরিসংখ্যান শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’-এর আওতায় পরিচালিত ‘হাউজহোল্ড বেজড এনভায়রনমেন্টাল সার্ভে (এইচবিইএস) ২০২৪’ থেকে একটি চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে: একজন মানুষ বছরে হাত ধোয়ার জন্য গড়ে ৩১,০৩২ লিটার পানি ব্যবহার করেন! এর পেছনে খরচ হয় প্রায় ৯৮১ টাকা। এটি সম্ভবত আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় পানি অপচয়ের একটি দিক, যা নিয়ে আমরা সচরাচর চিন্তা করি না।

জরিপ অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় একজন ব্যক্তির হাত ধোয়ার জন্য গড়ে ৩১,১৮৪ লিটার পানি ব্যবহার হয়, যার খরচ ৮৩১ টাকা। শহরে এই ব্যবহারের পরিমাণ কিছুটা কম (৩০,৬৮৩ লিটার), কিন্তু খরচ বেশি (১,৩১১ টাকা)। এই সংখ্যাগুলো আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও, যখন দেশের কোটি কোটি মানুষের সম্মিলিত ব্যবহারের কথা ভাবা হয়, তখন এর বিশালতা বোঝা যায়। সামান্য এই অভ্যাসও সম্মিলিতভাবে কতটা পানি অপচয় করতে পারে, তা এই তথ্য থেকে স্পষ্ট। এই বিপুল পরিমাণ পানি অপচয় জলসংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে, বিশেষ করে যেখানে সুপেয় পানির সরবরাহ এমনিতেই সীমিত।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও আমাদের করণীয়

গত রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস-এর অডিটরিয়ামে ৭টি জরিপ প্রতিবেদনের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এই তথ্যগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার বলেন, “এ ধরনের তথ্য পরিবেশজলবায়ু সম্পর্কিত সঠিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।” তিনি আরও জানান যে, প্রকল্পটি নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যেই বাস্তবায়ন হচ্ছে, যা সরকারের অঙ্গীকারবদ্ধতা প্রমাণ করে।

বিশেষ অতিথি ড. এ কে এনামুল হক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমরাই আমাদের সম্পদ ধ্বংস করছি। কৃষি জমিতে এখন জিঙ্ক নেই, যার ফলে অনেক প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নিচ্ছে। আগে হাওরে প্রচুর খালি জমি ছিল, এখন নেই। পশুপাখিও কমে গেছে। আগে যেসব স্থানে জঙ্গল ছিল, সেগুলো এখন হারিয়ে গেছে। নগরায়ন দ্রুতগতিতে বাড়ছে, যার ফলে পরিবেশ সংকট বাড়ছে।” তাঁর এই মন্তব্য আমাদের সমাজের একটি কঠিন সত্য তুলে ধরে। তিনি আরও বলেন, “প্রতিদিন আমরা গড়ে ৭২ লিটার পানি অপচয় করি। সচেতন না হলে সামনে ভয়াবহ বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।”

এই প্রতিবেদন আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। পানি এবং পরিবেশ – এই দুটি বিষয় একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সামান্য অসচেতনতাও কীভাবে বিশাল ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা আমরা দেখেছি। হাত ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজেও আমরা যে বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করি, তা অপচয় রোধে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য পৃথিবী উপহার দিতে হলে এখনই সচেতন হতে হবে। পানি সংরক্ষণ, বনায়ন বৃদ্ধি এবং কৃষিজমি সুরক্ষায় ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে উদ্যোগী হওয়া জরুরি। আমরা প্রত্যেকেই যদি নিজেদের অবস্থান থেকে ছোট ছোট পদক্ষেপ নিই, তবে তা সম্মিলিতভাবে বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে।

আপনারা যারা পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আগ্রহী, তাদের কাছে এই বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। চলুন, আমরা সবাই মিলে পানি অপচয় রোধ করি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় এগিয়ে আসি। আপনার মতামত নিচে কমেন্ট বক্সে জানান এবং এই বার্তাটি সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করুন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
spot_img

সর্বশেষ সংবাদ