ঢাকা শহর মানেই কংক্রিটের জঙ্গল, তীব্র গরম আর মাঝে মাঝেই লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি। কিন্তু এই সমস্যার সমাধানের একটি চাবিকাঠি হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের মাথার উপরেই—ভবনগুলোর অব্যবহৃত ছাদে। সম্প্রতি হাইকোর্টের একটি যুগান্তকারী নির্দেশ এই অব্যবহৃত ছাদগুলোকে এক একটি ‘সোনার খনি’ বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ঢাকার ছাদে ধুলো জমা সোলার প্যানেল
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ঢাকা শহরের প্রতিটি ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন ও সচল করার জন্য একটি সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। চলুন, এই নির্দেশের গভীরতা বিশ্লেষণ করি এবং বোঝার চেষ্টা করি, এটি কীভাবে আমাদের ঢাকা শহর, আমাদের পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার লড়াইয়ে একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে।
হাইকোর্টের নির্দেশটি আসলে কী?
প্রথমেই সহজভাবে জেনে নেওয়া যাক, হাইকোর্ট ঠিক কী কী নির্দেশ দিয়েছেন। এই আদেশের মূল দুটি অংশ:
১. নতুন কর্মপরিকল্পনা: বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, রাজউক এবং স্রেডা-কে (টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে বলা হয়েছে। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হবে ঢাকা শহরের প্রতিটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে পর্যাপ্ত ও কার্যকর সৌর প্যানেল স্থাপন নিশ্চিত করা।
২. বিদ্যমান প্যানেল সচল করা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশগুলোর একটি হলো, যেসব ভবনে এরই মধ্যে সৌর প্যানেল স্থাপন করা আছে, সেগুলোকে অবিলম্বে সচল করার ব্যবস্থা নেওয়া। ঢাকার ছাদে ধুলো জমা সোলার প্যানেল
আদালত এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটি রুলও জারি করেছেন। সহজ ভাষায়, আদালত জানতে চেয়েছেন, বিদ্যমান সৌর প্যানেলগুলো অকার্যকর রাখা কেন আইনবহির্ভূত এবং জনস্বার্থবিরোধী ঘোষণা করা হবে না? এর মাধ্যমে আদালত এই নিষ্ক্রিয়তার জন্য কর্তৃপক্ষকে সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় এনেছেন।
কেন এই নির্দেশ এত গুরুত্বপূর্ণ? আসল সমস্যা কোথায়?
আপনার নিজের ভবনে বা আশেপাশের ভবনে কি এমন সৌর প্যানেল দেখেছেন যা বছরের পর বছর ধরে ধুলো জমে অকেজো হয়ে পড়ে আছে? এই দৃশ্যটিই ঢাকার বাস্তবতা।
বেশ কয়েক বছর আগে নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদনের জন্য সৌর প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই নিয়মটি শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল। ডেভেলপার বা বাড়ির মালিকরা শুধুমাত্র ভবন নির্মাণের ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য নামমাত্র সৌর প্যানেল স্থাপন করেছেন। কিন্তু এরপর সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বা সচল রাখার কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। ঢাকার ছাদে ধুলো জমা সোলার প্যানেল
বেলার রিটে উঠে এসেছে এই মূল সমস্যাগুলো:
- নজরদারির অভাব: রাজউক বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এই প্যানেলগুলো সচল আছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।
- উদ্দেশ্যের ব্যর্থতা: যে মহৎ উদ্দেশ্যে (পরিবেশ রক্ষা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়) নিয়মটি করা হয়েছিল, তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
- সম্পদের অপচয়: কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এই সৌর প্যানেলগুলো এখন আবর্জনায় পরিণত হয়েছে।
হাইকোর্টের এই নির্দেশটি ঠিক এই ঘুমন্ত ব্যবস্থাকে নাড়া দিয়েছে। এটি শুধু নতুন প্যানেল বসানোর কথা বলছে না, বরং পুরনো ভুলগুলোকেও শুধরে নেওয়ার একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে।
অব্যবহৃত ছাদ: ঢাকার জন্য এক বিরাট সম্ভাবনা
ভাবুন তো একবার, ঢাকার লক্ষ লক্ষ ভবনের ছাদ যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে, তাহলে কী হতে পারে? বেলার ভাষ্যমতে, এই সম্ভাবনা বিশাল:
- গ্রিডের ওপর চাপ হ্রাস: প্রতিটি ভবন যদি নিজের বিদ্যুতের একটি অংশ সৌরশক্তি থেকে উৎপাদন করে, তাহলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। এর সরাসরি সুফল হবে লোডশেডিং হ্রাস।
- ভোক্তাদের খরচ সাশ্রয়: সৌর প্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে বাড়ির মালিকদের বিদ্যুৎ বিল কমে আসবে। নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করে আয় করার সুযোগও রয়েছে।
- পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা: এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন। জীবাশ্ম জ্বালানির (গ্যাস, তেল, কয়লা) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আমরা কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারি। ঢাকা শহর বিশ্বের অন্যতম দূষিত একটি নগরী। ছাদে সৌরশক্তির ব্যবহার এই শহরের পরিবেশ উন্নত করতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণেও সহায়ক হবে।
- টেকসই নগর উন্নয়ন: একটি আধুনিক ও টেকসই শহরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার। এই নির্দেশ ঢাকার টেকসই উন্নয়নের পথে একটি বড় মাইলফলক হতে পারে।
চ্যালেঞ্জ ও আগামী দিনের পথচলা
হাইকোর্টের নির্দেশ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, কিন্তু এর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী দিনে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে:
- কার্যকর পর্যবেক্ষণ: রাজউক ও স্রেডা কীভাবে লক্ষ লক্ষ ভবনের প্যানেল পর্যবেক্ষণ করবে? এর জন্য কি কোনো ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হবে?
- কারিগরি সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণ: প্যানেলগুলো সচল রাখতে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
- জনসচেতনতা: বাড়ির মালিক এবং ফ্ল্যাট মালিকদের মধ্যে সৌর প্যানেলের সুবিধা এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
- জবাবদিহিতা: যারা অমান্য করবে বা প্যানেল অকার্যকর রাখবে, তাদের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
আদালত এই আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ে আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন চেয়েছেন, যা আশার সঞ্চার করে। এটি নিশ্চিত করবে যে নির্দেশটি শুধু कागজে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
শেষ কথা
হাইকোর্টের এই রায়টি নিছক একটি আইনি নির্দেশ নয়, এটি একটি সবুজ ও টেকসই ঢাকা গড়ার স্বপ্নের দিকে একটি শক্তিশালী ধাক্কা। আমাদের অব্যবহৃত ছাদগুলো আর শুধু কাপড় শুকানো বা অব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখার জায়গা নয়, এগুলো হতে পারে আমাদের পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎস।
এই নির্দেশের সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সরকারি সংস্থাগুলোর সদিচ্ছা, কার্যকর পরিকল্পনা এবং আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণের ওপর। যদি আমরা সবাই মিলে এই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারি, তবে আমাদের এই প্রিয় ঢাকা শহর হয়ে উঠবে আরও বাসযোগ্য, এর পরিবেশ হবে নির্মল এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার বৈশ্বিক লড়াইয়ে বাংলাদেশ রাখবে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আপনার মতামত কী?
হাইকোর্টের এই নির্দেশ সম্পর্কে আপনার কী ভাবনা? আপনার এলাকার ভবনের সৌর প্যানেলগুলোর কী অবস্থা? এই উদ্যোগ সফল করতে আর কী করা যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন? নিচে কমেন্ট করে আপনার মতামত জানান।
আপনি বা আপনার প্রতিষ্ঠান কি নবায়নযোগ্য শক্তি বা টেকসই পরিবেশগত সমাধান নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী? এই খাতে বিনিয়োগ বা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পেতে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। একটি সবুজ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে আমরা আপনার সহযোগী হতে প্রস্তুত।