31 C
Bangladesh
শনিবার, আগস্ট ৩০, ২০২৫
spot_img

গাছ কাটার প্রতিবাদে উত্তাল জাবি: উপাচার্যও জানেন না, দায় নেবে কে?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়—নামটি শুনলেই চোখে ভাসে সবুজের সমারোহ, পাখির কলকাকলি আর লেকের জলে ফুটে থাকা লাল শাপলার এক মনোরম দৃশ্য। দেশের অন্যতম সবুজ এই ক্যাম্পাসটি অনেকের কাছেই প্রকৃতির এক নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সেই আশ্রয়েই যখন বারবার কুঠারের আঘাত হানা হয়, তখন প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। সম্প্রতি, আবারও অর্ধশতাধিক গাছ উপড়ে ফেলার ঘটনা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গাছ কাটার প্রতিবাদে উত্তাল জাবি

এই ঘটনাটি শুধু কয়েকটি গাছ কাটার বিষয় নয়। এর গভীরে লুকিয়ে আছে সমন্বয়হীনতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংসের এক বিপজ্জনক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। এই পোস্টে আমরা বিশ্লেষণ করব, কেন এই ঘটনাটি ঘটল এবং এর দায় আসলে কার? গাছ কাটার প্রতিবাদে উত্তাল জাবি

এক অদ্ভুত নাটকীয়তা: কেউ জানে না গাছ কাটার হুকুমদাতা কে!

ঘটনার সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দিক হলো এর দায় স্বীকারে অনীহা। গাণিতিক ও পদার্থবিষয়ক অনুষদের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য যখন এক্সকাভেটর দিয়ে গাছ উপড়ে ফেলা হচ্ছিল, তখন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক। শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাবে তারা দুজনেই জানান, কে গাছ কাটার অনুমতি দিয়েছে, সে বিষয়ে তারা অবগত নন!

ভাবুন তো একবার, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পরিচালক জানেন না, কারা তাদের ক্যাম্পাসের গাছ উপড়ে ফেলছে! ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলছে, তারা একজন ছাত্র প্রতিনিধির কথায় কাজ শুরু করেছে। অন্যদিকে, ছাত্র প্রতিনিধি বলছেন, একাডেমিক কার্যক্রমের জন্য ভবন প্রয়োজন, তাই ‘পরিবেশের ন্যূনতম ক্ষতি’ করে হলেও ভবন দরকার। গাছ কাটার প্রতিবাদে উত্তাল জাবি

এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেয়—এখানে একটি মারাত্মক সমন্বয়হীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। যখন সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষই দায় নিতে নারাজ, তখন এই ‘অজানা’ হুকুমের বলি হয় নিরীহ গাছগুলো।

মূল সংকট: মহাপরিকল্পনার অনুপস্থিতি

এই ঘটনার মূলে রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা—বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনুমোদিত মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান না থাকা। একটি মাস্টারপ্ল্যান হলো একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের একটি সুচিন্তিত নীলনকশা। কোথায় ভবন হবে, কোথায় সবুজ থাকবে, জলাশয় কীভাবে সংরক্ষিত হবে—তার সবই এই পরিকল্পনার অংশ।

মহাপরিকল্পনা না থাকায় যা হচ্ছে:

  1. স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত: যখন যেখানে প্রয়োজন মনে হচ্ছে, সেখানেই ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
  2. বারবার সংঘাত: শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবের সংকট সমাধানের জন্য ভবন চায়, তেমনি তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ পরিবেশ রক্ষায়ও সোচ্চার। মহাপরিকল্পনা না থাকায় এই দুই চাহিদার মধ্যে বারবার সংঘাত তৈরি হচ্ছে।
  3. পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি: অপরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার গাছ কাটা হয়েছে, ভরাট করা হয়েছে জলাশয়। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যহানি করছে না, বরং এর জীববৈচিত্র্য এবং বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

উপাচার্য জানিয়েছেন, মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং সেই পরামর্শ অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই কেন এত তাড়াহুড়ো করে গাছ উপড়ে ফেলা হলো?

‘ন্যূনতম ক্ষতি’র দর্শন: একটি বিপজ্জনক ফাঁদ

বিভাগের একজন ছাত্র প্রতিনিধি বলেছেন, “পরিবেশের ন্যূনতম ক্ষতি করে হলেও আমাদের ভবন দরকার।” এই দর্শনটি আপাতদৃষ্টিতে যৌক্তিক মনে হলেও এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। ‘ন্যূনতম ক্ষতি’র সংজ্ঞা কী? কে এটি নির্ধারণ করবে? আজ অর্ধশত, কাল একশত—এভাবে ‘ন্যূনতম ক্ষতি’ করতে করতে জাহাঙ্গীরনগরের সবুজ পরিচয়ই একদিন হারিয়ে যাবে।

উন্নয়ন এবং পরিবেশ পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। আধুনিক নগর পরিকল্পনায় সবুজকে রক্ষা করেই উন্নয়ন করা হয়। জাহাঙ্গীরনগরের মতো একটি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর জায়গায় এই ‘ন্যূনতম ক্ষতি’র দর্শন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং এখানকার চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত ছিল—কোনো ক্ষতি না করে কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, সেই পথ খুঁজে বের করা।

জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের দায়িত্ব

এই ঘটনাটিকে শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। যখন পুরো বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন-এর ভয়াবহ পরিণতির সঙ্গে লড়াই করছে, তখন প্রতিটি গাছ, প্রতিটি সবুজ চত্বর রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।

  1. শহুরে তাপমাত্রার বৃদ্ধি: জাহাঙ্গীরনগরের মতো সবুজ এলাকাগুলো আশপাশের অঞ্চলের জন্য ‘ফুসফুস’ হিসেবে কাজ করে। ব্যাপক হারে গাছ কাটার ফলে স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে, যা ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ (Urban Heat Island) প্রভাবকে আরও তীব্র করবে।
  2. জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল ধ্বংস: এই ক্যাম্পাসটি অসংখ্য পাখি, প্রজাপতি ও অন্যান্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল। গাছ কাটার মাধ্যমে আমরা শুধু উদ্ভিদই ধ্বংস করছি না, তাদের আবাসস্থলও কেড়ে নিচ্ছি।

উন্নয়নের নামে এই বৃক্ষনিধন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার বিরুদ্ধে আমাদের জাতীয় অঙ্গীকারের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

শেষ কথা: দায় কার?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্ধশতাধিক গাছ উপড়ে ফেলার দায় কোনো একক ব্যক্তির নয়। এর দায় একটি পদ্ধতির, একটি সংস্কৃতির।

  1. এর দায় সেই প্রশাসনিক কাঠামোর, যেখানে সর্বোচ্চ কর্তা জানেন না তার প্রতিষ্ঠানে কী ঘটছে।
  2. এর দায় সেই অপরিকল্পিত উন্নয়ন দর্শনের, যা মহাপরিকল্পনা ছাড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়।
  3. এর দায় আমাদের সেই মানসিকতার, যা কংক্রিটের কাঠামোর সামনে সবুজকে তুচ্ছ মনে করে।

শিক্ষার্থীরা ‘পাখির বাসা ধ্বংস করে উন্নয়ন চাই না‘ বলে স্লোগান দিচ্ছে। তাদের এই আর্তনাদই বলে দেয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী চায়। তারা উন্নয়ন চায়, তবে সেই উন্নয়ন হতে হবে প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে, প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়। এই ‘অজানা’ হুকুমের পেছনের শক্তিকে খুঁজে বের করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা না গেলে, জাহাঙ্গীরনগরের সবুজ বুকে এমন কুঠারের আঘাত বারবার ফিরে আসবে।

আপনার মতামত কী?

উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আপনার মতে করণীয় কী? একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত? নিচে কমেন্ট করে আপনার ভাবনাগুলো আমাদের সাথে শেয়ার করুন।

টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (EIA) এবং প্রাতিষ্ঠানিক সবুজ নীতি প্রণয়নে আগ্রহী? বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং কৌশলগত দিকনির্দেশনার জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। একটি সবুজ ও বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়তে আমরা আপনার সহযোগী হতে পারি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
spot_img

সর্বশেষ সংবাদ