31 C
Bangladesh
শনিবার, আগস্ট ৩০, ২০২৫
spot_img

আইন আছে, প্রয়োগ নেই: টাকার লোভে কি হারিয়ে যাবে মহাবিপন্ন বাগাড়?

ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে বসে মাছের বিশাল বাজার। পদ্মা নদীর তাজা মাছের গন্ধে ম ম করে চারপাশ। এর মধ্যেই শত শত মানুষের ভিড় ঠেলে চলে বেচাকেনা। কিন্তু এই ব্যস্ততার আড়ালে, খোদ নৌ পুলিশ ফাঁড়ির মাত্র কয়েক গজ দূরেই প্রতিদিন মঞ্চস্থ হচ্ছে এক নীরব অপরাধ নাট্য। অন্য সব মাছের সাথে প্রকাশ্যে, দরাদরি করে নিলামে উঠছে বাংলাদেশের মহাবিপন্ন প্রাণী—বাগাড় মাছ।  হারিয়ে যাবে মহাবিপন্ন বাগাড়

আইনের চোখে যা শিকার, বিক্রি ও পরিবহন দণ্ডনীয় অপরাধ, তা-ই যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখের সামনে অবাধে চলে, তখন প্রশ্ন জাগে—আইন কি শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ? এই পোস্টে আমরা শুধু এই অবৈধ বেচাকেনার খবরই তুলে ধরব না, বরং এর পেছনের কারণ, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা এবং আমাদের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের উপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিশ্লেষণ করব। হারিয়ে যাবে মহাবিপন্ন বাগাড়

“জানি এটা নিষিদ্ধ, কিন্তু জালে পড়লে করব কী?”

এটিই ছিল একজন জেলের সহজ সরল উত্তর, যখন তাকে মহাবিপন্ন বাগাড় শিকারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। এই একটি বাক্যই যেন পুরো সংকটের গভীরতাকে তুলে ধরে। জেলেরা বলছেন, তারা মূলত পাঙাশ বা রুই মাছের জন্য জাল ফেলেন, কিন্তু সেখানে যদি বাগাড় আটকা পড়ে, তবে তারা তা বিক্রি করা ছাড়া উপায় দেখেন না।

অন্যদিকে, ক্রেতারাও কিনছেন দেদারসে। তাদের যুক্তি, “জেলেরা ধরে আনছে, খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে, তাই আমরাও কিনছি।” দৌলতদিয়া ঘাটে গত কয়েক দিনেই বিক্রি হয়েছে ১২-১৩টি বড় বাগাড়। একজন ব্যবসায়ী তো একদিনেই প্রায় ৫০ কেজি ওজনের একটি বাগাড় ৭৭,৫০০ টাকায় কিনে ৮০,০০০ টাকায় বিক্রি করেছেন!

এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে:

  1. অপরাধের স্বাভাবিকীকরণ: অবৈধ কাজটি এতটাই প্রকাশ্যে এবং নিয়মিত হচ্ছে যে, জেলে বা ক্রেতা—কারোরই এটিকে বড় কোনো অপরাধ বলে মনে হচ্ছে না।
  2. আর্থিক প্রলোভন: একটি বাগাড় মাছ বিক্রি করে হাজার হাজার টাকা পাওয়া যায়। এই বিপুল আর্থিক লাভের সামনে আইনের নিষেধাজ্ঞা এবং পরিবেশ রক্ষার ভাবনা তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে।
  3. সচেতনতার অভাব নাকি অবহেলা?: মৎস্য আড়তদারদের মতে, মৎস্য বিভাগ অনেক আগেই তাদের বাগাড়ের বিষয়ে অবহিত করেছিল। অর্থাৎ, তারা জেনেশুনেই এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

দায় কার? প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার এক হতাশাজনক চিত্র

সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্রটি ফুটে ওঠে যখন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সামনে আসে। এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করার দায়িত্ব কার—এই প্রশ্নে যেন চলছে এক অদ্ভুত ‘দায় এড়ানোর খেলা’।

  1. নৌ পুলিশ: চোখের সামনে বাগাড় বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, “বিষয়টি নিয়ে ওইভাবে ভাবা হয়নি। এখন থেকে গুরুত্বসহকারে দেখব।” আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এই বক্তব্য তাদের গাফিলতিকেই স্পষ্ট করে।
  2. জেলা মৎস্য কর্মকর্তা: তার বক্তব্য আরও জটিল। তিনি জানান, মৎস্য আইনে বাগাড় নিষিদ্ধের কথা বলা নেই, এটি আছে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনে। তাই তারা শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে পারেন, সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারেন না।
  3. উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা: তিনি বলছেন, বন্য প্রাণী অধিদপ্তর থেকে প্রসিকিউশন বা অভিযোগ পেলেই তারা ব্যবস্থা নিতে পারেন। খবর পেয়ে অভিযান চালানোর আগেই অপরাধীরা পালিয়ে যায়।

এই বক্তব্যগুলো থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—বাগাড় রক্ষার আইনটি যেন এক ‘এতিম আইন’। এর অভিভাবক কে, তা নিয়েই সংশয়। মৎস্য বিভাগ, বন বিভাগ (বন্য প্রাণী শাখা), পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন—এই সংস্থাগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট সমন্বয়ের অভাবে আইন থাকা সত্ত্বেও তার কোনো প্রয়োগ হচ্ছে না। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাই অপরাধীদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ। হারিয়ে যাবে মহাবিপন্ন বাগাড়

কেন একটি মাছ এত গুরুত্বপূর্ণ? পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট

অনেকে ভাবতে পারেন, একটি মাছ হারিয়ে গেলে আমাদের পরিবেশ-এর আর কী এমন ক্ষতি হবে? এখানেই লুকিয়ে আছে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। বাগাড় শুধু একটি মাছ নয়, এটি নদীর বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম শীর্ষ শিকারী।

  1. নদীর স্বাস্থ্যরক্ষক: বাগাড়ের মতো শীর্ষ শিকারী, নদীর ছোট ও দুর্বল মাছ খেয়ে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করে। এরা হারিয়ে গেলে নদীর খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে, যা পুরো বাস্তুতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়।
  2. জীববৈচিত্র্যের সূচক: একটি নদীতে বাগাড়ের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে সেই নদীর স্বাস্থ্য এখনো ভালো আছে। তাদের বিপন্ন হওয়াটা নদীর সামগ্রিক দূষণ এবং অবক্ষয়ের একটি বড় সতর্কবার্তা।
  3. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব:জলবায়ু পরিবর্তন-এর কারণে আমাদের নদীগুলো এমনিতেই সংকটে আছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া এবং অনিয়মিত বন্যার কারণে নদীর বাস্তুতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর উপর যদি নির্বিচারে বাগাড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি শিকার করা হয়, তবে সেই বাস্তুতন্ত্রের ভেঙে পড়া শুধু সময়ের ব্যাপার। একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার প্রাকৃতিক বর্ম। বাগাড় শিকার করে আমরা সেই বর্মকেই ফুটো করে দিচ্ছি।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) বাগাড়কে ‘মহাবিপন্ন’ (Critically Endangered) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, যার অর্থ প্রকৃতি থেকে এটি বিলুপ্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।

শেষ কথা: সমাধান কোন পথে?

দৌলতদিয়া ঘাটে বাগাড়ের প্রকাশ্য নিলাম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, শুধু আইন তৈরি করলেই পরিবেশ রক্ষা হয় না, প্রয়োজন সেই আইনের কঠোর এবং সমন্বিত প্রয়োগ। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

১. সমন্বিত টাস্কফোর্স: মৎস্য অধিদপ্তর, বন বিভাগ, নৌ পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করবে।

২. দায়িত্ব নির্দিষ্টকরণ: আইনের প্রয়োগের দায়িত্ব কোন সংস্থার, তা সুস্পষ্ট করে দিতে হবে যাতে কেউ দায় এড়াতে না পারে।

৩. কঠোর শাস্তি: অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অন্যরা ভয় পায়।

৪. বিকল্প কর্মসংস্থান: শুধুমাত্র জেলেদের দোষারোপ না করে, তাদের জন্য বিকল্প এবং টেকসই আয়ের উৎস তৈরি করতে হবে।

মহাবিপন্ন বাগাড় মাছের কান্না শোনার মতো কেউ কি আছে? নাকি আইনের এই ঘুম ভাঙার আগেই নদীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে এই মহাপ্রাণী? এই প্রশ্নের উত্তরের উপরই নির্ভর করছে আমাদের নদী ও পরিবেশের ভবিষ্যৎ।

আপনার মতামত কী?

এই প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা দূর করতে আপনার পরামর্শ কী? মহাবিপন্ন প্রাণী রক্ষায় সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের করণীয় কী হতে পারে? নিচে কমেন্ট করে আপনার মূল্যবান মতামত জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও পড়ুন

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
spot_img

সর্বশেষ সংবাদ