টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে সম্প্রতি একটি অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখা গেছে। একটি এস্কেভেটর (ভেকু) গর্জন করে এগিয়ে যাচ্ছে, তবে কোনো নতুন রাস্তা বা স্থাপনা তৈরির জন্য নয়, বরং দুটি অবৈধ কারখানা মাটির সাথে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এই ধ্বংসযজ্ঞের খবরটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ অভিযান মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের পরিবেশ রক্ষার এক মরণপণ লড়াই এবং গজারি বনের নীরব কান্নার এক করুণ আখ্যান। বনকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচালো প্রশাসন ও এলাকাবাসী
প্রশাসনের এই অভিযান শুধু দুটি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেনি, বরং একটি সবুজ বনকে বিষাক্ত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। যে চক্রটি গহীন গজারি বনের আড়ালে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরির মতো ভয়ঙ্কর খেলায় মেতেছিল, তারা শুধু আইনই ভাঙছিল না, তারা আমাদের মাটি, পানি, বাতাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছিল। চলুন, এই অভিযানের সূত্র ধরে গভীরে প্রবেশ করি এবং বুঝি, কেন এই ঘটনাটি আমাদের সবার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বনকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচালো প্রশাসন ও এলাকাবাসী
অপরাধের কেন্দ্র: কেন গজারি বনকেই বেছে নেওয়া হলো?
অপরাধীরা তাদের অবৈধ কার্যকলাপের জন্য সাধারণত নির্জন এবং দুর্গম এলাকা বেছে নেয়, যেখানে আইনের চোখ সহজে পৌঁছায় না। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সাগরদীঘি ইউনিয়নের কামালপুর পাহাড়ি এলাকাটি ঠিক তেমনই একটি জায়গা। শাল-গজারির এই বন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র। বনকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচালো প্রশাসন ও এলাকাবাসী
গজারি বন (Sal Forest) আমাদের দেশের ফুসফুসের মতো কাজ করে। এটি হাজারো প্রজাতির পশুপাখি ও কীটপতঙ্গের আশ্রয়স্থল। এই বনের গাছপালা মাটির ক্ষয় রোধ করে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখে এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সাহায্য করে। ঠিক এমনই একটি संवेदनशील ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঢালের ভেতরে সিসা কারখানা স্থাপন করাটা পরিবেশের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। অপরাধী চক্রটি ভেবেছিল, বনের গহীনে তাদের এই বিষাক্ত সাম্রাজ্যের খবর কেউ পাবে না। কিন্তু তারা স্থানীয় মানুষের সচেতনতা এবং প্রশাসনের দৃঢ়তাকে হিসেবে আনেনি।
নীরব ঘাতক: সিসা কারখানা কতটা ভয়ঙ্কর?
পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরি করাকে বিশ্বের অন্যতম বিষাক্ত শিল্পগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হয়। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং মারাত্মক:
১. বাতাসে বিষ: যখন পুরোনো ব্যাটারি পোড়ানো হয়, তখন সিসার কণা এবং বিষাক্ত গ্যাস (লেড অক্সাইড) বাতাসে মিশে যায়। এই বিষাক্ত ধোঁয়া শুধু কারখানার শ্রমিকদেরই নয়, বরং বনের পশুপাখি এবং আশেপাশের এলাকার মানুষের ফুসফুসেও প্রবেশ করে। এটি শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে।
২. মাটির মৃত্যু: সিসার ভারী কণাগুলো মাটিতে মিশে যায় এবং মাটিকে চিরতরে বিষাক্ত করে তোলে। এই মাটিতে কোনো ফসল বা দেশীয় উদ্ভিদ জন্মানো কঠিন হয়ে পড়ে। যে গজারি বন শত শত বছর ধরে উর্বর ছিল, সেই বনের মাটি কয়েক বছরের মধ্যেই বন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
৩. পানিতে মহাবিপদ: বৃষ্টির পানিতে এই সিসা ধুয়ে আশেপাশের জলাশয়, খাল-বিল এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যায়। সেই পানি যখন মানুষ ও পশু-পাখি পান করে, তখন তা এক নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করে। সিসা মানবদেহে, বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করে। এটি স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি এবং প্রজনন ক্ষমতার উপর স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
এই কারখানা দুটি আক্ষরিক অর্থেই গজারি বনের قلبে বসে ধীরে ধীরে পুরো এলাকাকে একটি ‘ডেথ জোনে’ পরিণত করছিল।
প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ: একটি আশার আলো
এই ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় প্রশাসন এবং সচেতন এলাকাবাসী। এলাকাবাসীর দেওয়া খবরের ভিত্তিতে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের নির্দেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু সাঈদের নেতৃত্বে যে অভিযান পরিচালিত হয়েছে, তা প্রশংসার যোগ্য।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো একক উদ্যোগ ছিল না। এই অভিযানে পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং বন বিভাগের সম্মিলিত উপস্থিতি দেখা গেছে। এটি প্রমাণ করে যে, পরিবেশ রক্ষার মতো একটি জটিল এবং বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে এমন সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। দুটি কারখানাকে ভেকু দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়াটা ছিল একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা—পরিবেশের ক্ষতি করে কেউ পার পাবে না।
বড় প্রেক্ষাপট: এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়
টাঙ্গাইলের এই ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে আমরা বড় ছবিটি হারিয়ে ফেলব। এটি আসলে একটি বৃহত্তর সংকটের উপসর্গ। এই সংকট হলো—স্বল্পমেয়াদী অবৈধ অর্থনৈতিক লাভের লোভ বনাম দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত স্থায়িত্বের লড়াই।
সারা দেশেই এমন অনেক চক্র রয়েছে, যারা পরিবেশগত আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে নদী, পাহাড়, বন ধ্বংস করে নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। এই ধরনের কার্যকলাপ সরাসরি আমাদের পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন-এর সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। যখন একটি বন উজাড় হয়, তখন আমরা শুধু কিছু গাছ হারাই না; আমরা কার্বন শোষণের একটি প্রাকৃতিক যন্ত্র হারাই, জীববৈচিত্র্যের একটি ভান্ডার হারাই এবং জলবায়ুর অভিঘাত থেকে বাঁচার একটি প্রাকৃতিক বর্ম হারাই।
সুতরাং, গজারি বনের ভেতরের এই সিসা কারখানা শুধু স্থানীয় পরিবেশেরই শত্রু ছিল না, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আমাদের জাতীয় লড়াইকেও দুর্বল করে দিচ্ছিল।
শেষ কথা
ঘাটাইলের এই অভিযান একটি সফলতার গল্প, একটি বিজয়ের প্রতীক। এটি আমাদের দেখায় যে, মানুষ সচেতন হলে এবং প্রশাসন দৃঢ় থাকলে যেকোনো অপশক্তিকে রুখে দেওয়া সম্ভব। ইউএনও আবু সাঈদের বক্তব্য, “বন ও পরিবেশ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে,” আমাদের আশান্বিত করে।
তবে এই একটি অভিযানেই আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। এই যুদ্ধটা দীর্ঘ। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা সামাজিকভাবে পরিবেশের গুরুত্ব অনুধাবন করব এবং আইন প্রয়োগে শূন্য সহনশীলতা (zero tolerance) নীতি গ্রহণ করব, ততক্ষণ গজারি বনের মতো দেশের অন্য কোনো প্রাকৃতিক সম্পদে নতুন করে বিষাক্ত ছোবল পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। আজ ভেকুর যে গর্জন আমরা শুনেছি, তা হোক পরিবেশ ধ্বংসকারীদের জন্য অশনি সংকেত আর প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য নিরাময়ের সূচনা সঙ্গীত।
আপনার মতামত কী?
আপনার এলাকায় কি বন বা নদী দখল করে এমন অবৈধ কার্যকলাপ চলছে? পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের এই ধরনের উদ্যোগকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এই লড়াইকে আরও কার্যকর করতে আমাদের আর কী কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? আপনার ভাবনাগুলো কমেন্ট বক্সে আমাদের সাথে শেয়ার করুন।