আমাদের চারপাশের প্রকৃতি মাঝে মাঝে এমন কিছু সংকেত দেয়, যা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। সম্প্রতি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কছিম বাজার এলাকায় ঠিক তেমনই এক ঘটনা ঘটেছে। আকাশ থেকে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে মাটিতে নেমে এলো বিশাল এক পাখি। সাধারণ কোনো পাখি নয়, এটি বিলুপ্তপ্রায় বিপন্ন প্রজাতির ‘হিমালয়ান গৃধিনী’ শকুন।
রোববার সকালে স্থানীয় বাসিন্দা আমিন হোসেনের জমিতে শকুনটিকে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন এলাকাবাসী। এরপর পরিবেশবাদী সংগঠন ‘তীর’ (টিম ফর এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ) এবং বন বিভাগের তৎপরতায় উদ্ধার করা হয় এই পরিযায়ী পাখিটিকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হিমালয়ের এই রাজকীয় পাখি কেন আমাদের সমতলে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ছে?
হিমালয় থেকে গাইবান্ধা: কেন এই দীর্ঘ যাত্রা?
আইইউসিএন (IUCN) কর্মকর্তাদের মতে, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে হিমালয়ের পাদদেশে যখন তীব্র শীত আর তুষারঝড় শুরু হয়, তখন এই ‘হিমালয়ান গৃধিনী’রা একটু উষ্ণতার খোঁজে দক্ষিণ দিকে বা সমতলের দিকে চলে আসে।
- ক্লান্তি না কি অসুস্থতা? আমরা অনেকেই মনে করি পাখিটি অসুস্থ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হাজার মাইলের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এরা এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে, বিশ্রামের পর নতুন করে ডানা মেলার শক্তি পায় না।
- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার ধরণ পাল্টাচ্ছে। হঠাৎ তীব্র ঠান্ডা বা খাদ্যের অভাব এই পরিযায়ী পাখিদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
কেন শকুনকে আমাদের প্রয়োজন? (প্রকৃতির ঝাড়ুদার কাহিনী)
অনেকেই শকুনকে অশুভ মনে করেন বা ভয় পান। কিন্তু সত্যি বলতে, শকুন আমাদের পরিবেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু। গাইবান্ধা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ খলিলুর রহমান চমৎকার একটি কথা বলেছেন—এরা হলো ‘প্রকৃতির ঝাড়ুদার’।
- রোগ প্রতিরোধ: মৃত পশুর মাংস খেয়ে এরা অ্যানথ্রাক্স বা জলাতঙ্কের মতো মারাত্মক জীবাণু ছড়িয়ে পড়া রোধ করে।
- পরিবেশের ভারসাম্য: শকুন না থাকলে মৃত পশুর দেহ পচে পরিবেশে রোগজীবাণু ছড়াত, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের ক্ষতি করত।
- বিনামূল্যে সার্ভিস: পরিবেশ পরিষ্কার রাখার জন্য তারা কোনো বেতন নেয় না, শুধু একটু বাঁচার সুযোগ চায়!
আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান: আমরা কি শেষ রক্ষা করতে পারব?
বাংলাদেশে একসময় সাত প্রজাতির শকুন দেখা যেত। কিন্তু এখন?
- রাজশকুন: পুরোপুরি বিলুপ্ত।
- বাংলা শকুন: সারাদেশে মাত্র ২৬০টির মতো টিকে আছে।
- হিমালয়ান গৃধিনী: এরা পরিযায়ী হিসেবে আসলেও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে সংখ্যায় কমছে।
গাইবান্ধায় উদ্ধার হওয়া এই শকুনটিকে বর্তমানে দিনাজপুরের সিংড়া জাতীয় উদ্যানের ‘শকুন উদ্ধার ও পরিচর্যাকেন্দ্রে’ পাঠানো হয়েছে। সেখানে সঠিক চিকিৎসা ও পুষ্টি পেলে এটি আবার আকাশে ডানা মেলতে পারবে।
একটি জরুরি অনুরোধ: লোকালয়ে কোনো শকুন বা বিরল বন্যপ্রাণী দেখলে দয়া করে সেটিকে আঘাত করবেন না। তারা আপনার শত্রু নয়, বরং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার কারিগর।
উপসংহার
গাইবান্ধার এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী রক্ষা কেবল বন বিভাগের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সবার নৈতিক কর্তব্য। আজ যদি আমরা এই বিপন্ন প্রাণীদের রক্ষা করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে আমাদের বাস্তুসংস্থান ভেঙে পড়বে।
আপনার মতামত কী?
আপনি কি কখনও কাছ থেকে শকুন দেখেছেন? বা আপনার এলাকায় কি কখনও এমন বিরল কোনো বন্যপ্রাণী উদ্ধার হয়েছে? কমেন্টে আমাদের জানান এবং পোস্টটি শেয়ার করে সচেতনতা তৈরিতে সাহায্য করুন।



