সুন্দরবনে বাঘ ও ‘ছিটকে’ ফাঁদের মরণকামড়: আমরা কি সত্যিই প্রকৃতিকে ভালোবাসছি?
সুন্দরবন মানেই আমাদের গর্ব, আমাদের সবুজ রক্ষাকবচ। কিন্তু সেই বনেই যখন আমাদের জাতীয় পশু বাঘকে মানুষের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা আসলে কোন দিকে যাচ্ছি? সম্প্রতি সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী এলাকায় একটি বাঘিনী ফাঁদে আটকা পড়ার ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, বনের গভীরতা বাড়লেও বন্যপ্রাণীদের নিরাপত্তা কমছে।
কী ঘটেছিল বৈদ্যমারী এলাকায়?
গত শনিবার সুন্দরবনের শরকির খাল সংলগ্ন এলাকায় একটি বাঘিনী হরিণ শিকারিদের পাতা ‘ছিটকে ফাঁদে’ আটকে পড়ে। স্থানীয়দের খবরে বন বিভাগ দ্রুত ব্যবস্থা নিলেও ততক্ষণে বাঘিনীটির বাঁ পায়ে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। ট্রাঙ্কুইলাইজার গান ব্যবহার করে তাকে অচেতন করে উদ্ধার করা হলেও, তার শারীরিক অবস্থা এখন চিকিৎসার অধীনে।
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, বাঘ উদ্ধারের পর সোমবার ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে বন বিভাগ আরও আটটি ছিটকে ফাঁদ উদ্ধার করেছে। এর মানে হলো, শিকারিরা বনের আনাচে-কানাচে মৃত্যুকূপ বিছিয়ে রেখেছে।
এই ‘ছিটকে ফাঁদ’ আসলে কতটা ভয়ংকর?
শিকারিরা সাধারণত তিন ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করে: মালা ফাঁদ, হাঁটা ফাঁদ এবং ছিটকে ফাঁদ। এর মধ্যে ছিটকে ফাঁদ হলো সবচেয়ে কৌশলী এবং বিপজ্জনক।
- তৈরির কৌশল: সাধারণ দড়ি এবং নমনীয় গাছের ডাল দিয়ে এটি তৈরি করা হয়।
- অদৃশ্য মরণফাঁদ: শিকারিরা এটি শুকনা ঘাস-পাতা দিয়ে ঢেকে রাখে। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই।
- কার্যপদ্ধতি: যখনই কোনো প্রাণী (হরিণ, বাঘ বা বুনো শুকর) এর ওপর পা রাখে, অমনি দড়ির ফাঁসটি তীব্র বেগে আটকে যায় এবং প্রাণীকে ঝুলিয়ে ফেলে। প্রাণীটি যত বেশি ছোটাছুটি করে, ফাঁস তত বেশি কষে বসে মাংসের গভীরে ঢুকে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের হস্তক্ষেপ: দ্বিমুখী সংকট
সুন্দরবনের এই পরিস্থিতির পেছনে কেবল শিকারিদের লোভ দায়ী নয়, বরং ভৌগোলিক কিছু পরিবর্তনও কাজ করছে।
- নদী খনন ও যাতায়াতের সুবিধা: বর্তমানে শরকির খালে খনন কাজ চলছে। শুকনো মৌসুমে পানি কম থাকায় এবং খননের ফলে পলি জমে এখন মানুষ খুব সহজেই বনের গভীরে পায়ে হেঁটে ঢুকতে পারছে।
- জলবায়ু ও খাদ্যাভাব: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বনের বাস্তুসংস্থান বদলে যাচ্ছে। মিঠা পানির অভাব এবং ম্যানগ্রোভ বনের পরিবর্তন বন্যপ্রাণীদের লোকালয়ের কাছাকাছি আসতে বাধ্য করছে, যা শিকারিদের কাজ আরও সহজ করে দিচ্ছে।
বন বিভাগের ভূমিকা ও জনসচেতনতা
চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে চারটি পৃথক দল এখন সুন্দরবনে চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে তারা জয়মনির ঠোঁটা থেকে শরকির খাল পর্যন্ত নজরদারি বাড়িয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বন বিভাগের কতিপয় লোক দিয়ে কি বিশাল এই সুন্দরবন রক্ষা করা সম্ভব?
আমাদের সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে, সুন্দরবনে বাঘ না থাকলে বন বাঁচবে না। আর বন না থাকলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপ থেকে উপকূলীয় মানুষকে বাঁচানোর আর কোনো ঢাল থাকবে না। যারা কয়েক কেজি হরিণের মাংসের লোভে এই ফাঁদ পাতছে, তারা আসলে নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কবর খুঁড়ছে।
উপসংহার
বাঘিনীটি বর্তমানে খুলনায় চিকিৎসাধীন। আমরা আশা করি সে দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার বনে ফিরে যাবে। কিন্তু যে আটটি ফাঁদ উদ্ধার হলো, সেগুলো কেবল দড়ির টুকরো নয়—সেগুলো আমাদের মানবিকতার পরাজয়ের চিহ্ন। বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধে কঠোর আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি।
আপনার মতামত কী?
সুন্দরবনের এই চোরা শিকার বন্ধে আপনার মাথায় কি কোনো উদ্ভাবনী আইডিয়া আছে? কিংবা বন বিভাগের নজরদারি আরও বাড়ানোর জন্য কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? নিচের কমেন্ট বক্সে আমাদের জানান।
এই পোস্টটি শেয়ার করে অন্যদেরও সচেতন করুন। সুন্দরবন বাঁচলে, বাঁচবো আমরাও!



